ফেব্রুয়ারির শোক, ভাষার অহংকার?
ফেব্রুয়ারি শুধু একটি মাস নয় — এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক আবেগ, এক ইতিহাস, এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। এই মাসকে কেবল “ভাষার মাস” বলে সংজ্ঞায়িত করলে তার ব্যাপ্তি ও গভীরতা পুরোপুরি প্রকাশ পায় না। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আত্মদান, আর সেই আত্মত্যাগের অন্তর্লীন আবেগ — সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় চেতনার এক অনন্য অধ্যায়।

ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মরণ করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। তাঁদের ত্যাগের গভীরতা শব্দে প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। তবে প্রশ্ন জাগে — আমরা কি সেই চেতনাকে সব সময় হৃদয়ে ধারণ করি? নাকি কেবল ফেব্রুয়ারি এলেই ভাষার প্রতি আমাদের আবেগ জেগে ওঠে?
আমরা বাঙালি, কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রেই বাংলায় কথা বলতে বা নিজেকে প্রকাশ করতে আমাদের দ্বিধা কাজ করে। অন্য ভাষায় কথা বলতে আমরা যেন বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কখনো কখনো নিজের অনুভূতি প্রকাশের উপযুক্ত বাংলা শব্দ খুঁজে না পেয়ে আমরা অন্য ভাষার শরণাপন্ন হই। যে স্বপ্ন নিয়ে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল, এটি কি সেই স্বপ্নের পূর্ণতা?
অন্যান্য জাতির দিকে তাকালে দেখা যায় — চীনা বা ফরাসিরা তাঁদের ভাষার মর্যাদা অটুট রেখেছে। হয়তো তাঁদের এ ধরনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ইতিহাস নেই, কিন্তু ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও ব্যবহারিক চর্চায় তারা দৃঢ়। সেখানে আমরা কি আমাদের অর্জনকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পারছি?

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা আবেগপ্রবণ জাতি — সংগ্রাম করি, বিপ্লব ঘটাই; কিন্তু সেই বিপ্লবের চেতনাকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে পারি তো? আত্মসমালোচনার জায়গাও রয়েছে। আজ হয়তো দোলনচাঁপা বাংলায় লিখছি, কিন্তু সবসময় কি তা করেছে? আমাদের অনেক প্রকাশ, অনেক লেখা — অন্য ভাষাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। তাহলে কি ভাষার প্রতি আমাদের আবেগ কেবল এক দিনের, এক মাসের?
তর্কে না গিয়ে স্বীকার করাই ভালো — ভুল আমাদেরই। আর সেই স্বীকারোক্তিই হতে পারে পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।
সম্প্রতি একটি চিত্রকর্ম এই ভাবনাগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ভাস্কর মৃণাল হক-এর বিখ্যাত ভাস্কর্য জননী ও গর্বিত বর্ণমালা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শিল্পী রূপ রয় তাঁর ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে ফুটিয়ে তুলেছেন এক মায়ের ত্যাগ ও ভাষা আন্দোলনের গভীর বেদনার প্রতিচ্ছবি। ভাস্কর্যটিতে দেখা যায় এক মাকে, যিনি আন্দোলনের সময় শহীদ হওয়া তাঁর সন্তানকে বয়ে নিয়ে চলেছেন — মায়ের বুকে সন্তানের নিথর দেহ, কিন্তু মুখে অদম্য গর্ব ও বেদনার মিশ্র ছাপ।
ঢাকার বাংলা মোটরের কাছে পরিবাগ এলাকায় অবস্থিত এই ভাস্কর্য আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় — ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি, আত্মমর্যাদার প্রতীক।
ফেব্রুয়ারি তাই শোকেরও, আবার গৌরবেরও। এই মাস আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায় — আমরা কি সত্যিই আমাদের ভাষাকে যথাযোগ্য সম্মান দিচ্ছি? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে এখনই সময় বদলে যাওয়ার। কারণ ভাষার জন্য যে ত্যাগ, তা যেন কেবল স্মৃতিস্তম্ভে নয় — আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও বেঁচে থাকে।



